গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ভূ-রাজনীতিতে তাঁর বর্তমান অবস্থান নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা যদি গণভবনে অবস্থানকালে প্রাণ দিতেন কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়ে জেলে যাওয়ার সাহস দেখাতেন, তবে তিনি নিজের দল আওয়ামী লীগ এবং মিত্র দেশ ভারতের কাছে একজন ‘লিজেন্ডারি যোদ্ধা’ বা রাজনৈতিক ‘অ্যাসেট’ (সম্পদ) হিসেবে মূল্যায়িত হতেন।
তবে নাটকীয়ভাবে হেলিকপ্টার ও বিমানে করে দেশ ছাড়ার পর দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ‘আয়রন লেডি’ খ্যাত শেখ হাসিনা এই পলায়নের কারণে রাজনৈতিকভাবে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ এবং সাউথ ব্লকের (ভারতীয় নীতিনির্ধারক) জন্য রাজনৈতিক ‘অ্যাসেট’ হওয়ার বদলে উল্টো একটি বড় ‘লায়বিলিটি’ বা দায় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
পণ্য বা প্রোডাক্টের লাইফ সাইকেলের সাথে তুলনা করে বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনার সক্রিয় রাজনৈতিক উপযোগিতা এখন শেষের দিকে। এমতাবস্থায় ভারতের নীতিনির্ধারকরা তাঁর অবশিষ্ট রাজনৈতিক গুরুত্ব বা ‘স্যালভেজ ভ্যালু’ যতটা সম্ভব উদ্ধার করে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে চাইবে। ভারতে শান্তিতে বসবাস করে জীবন পার করে দিলে তাঁর কোনো ‘রিসেল ভ্যালু’ বা নতুন রাজনৈতিক উপযোগিতা তৈরি হবে না। কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তিনি মারা গেলেই কেবল তাঁকে ‘শহীদ’ হিসেবে রাজনৈতিক মাঠে ব্যবহার করা সম্ভব—যা ভারত, আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক মহল ভালোভাবে অবগত।
তবে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার মৃত্যু হলে তা দিল্লির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর (ডিসক্রেডিট) হতে পারে। তাই ভারতকে কৌশলগতভাবে অন্য পথ বেছে নিতে হতে পারে। ভারতকে দীর্ঘ মেয়াদে একটি সেফ হাউজে লালন-পালন করার চেয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো দিল্লির জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক ও কৌশলগত সুবিধাজনক হতে পারে।
শেখ হাসিনা বাংলাদেশের কারাগারে থাকলে সেই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে ভেতরে ও বাইরে থেকে নানামুখী চাপে রাখার সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে ঝিমিয়ে পড়া আওয়ামী লীগের তৃণমূল কর্মীরাও নেত্রীর মুক্তির দাবিতে আবার চাঙ্গা হওয়ার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি তাঁর জেলজীবনকে কেন্দ্র করে সিনেমা, সাহিত্য ও আবেগঘন প্রচারণার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অতীতের ১৫ বছরের নেতিবাচক ভাবমূর্তি ক্ষালনের একটা চেষ্টা চালানো সম্ভব হবে।
সবচেয়ে বড় সমীকরণটি তৈরি হবে যদি শেখ হাসিনা বাংলাদেশের কারাগারে থাকা অবস্থায় অসুস্থতায়, আইনি দণ্ডে কিংবা আদালতে আনা-নেওয়ার পথে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার শিকার হয়ে মারা যান। তেমনটি হলে ভারত ও আওয়ামী লীগের জন্য তাঁর রাজনৈতিক উপযোগিতা বা ‘স্যালভেজ ভ্যালু’ শতভাগ নিশ্চিত হবে। তখন আওয়ামী লীগ একজন ‘তাজা শহীদ’ পাওয়ার দাবি করতে পারবে, যা ব্যবহার করে দলটির বিগত ১৫ বছরের সব অপরাধ ও দায়মুক্তির রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করা হবে।







