জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর প্রকল্প নিয়ে একাত্তর টিভি, দৈনিক মানবজমিন ও দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর সত্যতা যাচাই করেছে অনুসন্ধানমূলক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডিসেন্ট’। তাদের ফ্যাক্ট-চেকে উঠে এসেছে যে, মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে প্রচারিত আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির একাধিক দাবি সম্পূর্ণ অসত্য, বিভ্রান্তিকর এবং আংশিক সত্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
দেড়শ কোটি টাকা আত্মসাতের দাবি অসত্য: একাত্তর টিভির প্রতিবেদনে ‘দেড়শ কোটি টাকা নিয়ে নয়ছয়’ করার যে দাবি শিরোনামে করা হয়েছে, তা অসত্য। সরকারি নথি অনুযায়ী, গণপূর্ত ও জাতীয় জাদুঘর মিলিয়ে প্রকল্পটির চূড়ান্ত বরাদ্দ ছিল ১২৩ কোটি ৪৫ লক্ষ ২১ হাজার টাকা। এর মধ্যে কাজ শেষে ১২ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা সরকারের কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং মোট খরচ হয়েছে ১১০ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা।
ভবন নির্মাণ না করেই টাকা খরচের দাবি বিভ্রান্তিকর: ‘কোনো ভবন নির্মাণ ছাড়াই এত টাকা খরচ কোথায় হলো’—গণমাধ্যমগুলোর এমন দাবি বিভ্রান্তি তৈরি করে। মূলত লুই আইক্যানের মূল নকশা অক্ষুণ্ণ রাখতে এখানে কোনো নতুন ভবন তৈরি করা হয়নি। তবে ১৭ একর জমিতে ৫টি ওয়াকওয়ে, লেক সম্প্রসারণ, ফুডকোর্ট, প্রতীকী আয়নাঘর, ৪ হাজার শহীদের স্মৃতিস্তম্ভ এবং মূল ভবনের সংস্কার ও বিদ্যুতায়নের বিশাল কাজ গণপূর্ত বিভাগ সম্পন্ন করেছে।
বাউন্ডারি নির্মাণে ডাবল বিলিংয়ের অভিযোগ অসত্য: জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বাউন্ডারি নির্মাণে ৬৪ লাখ টাকা আলাদা খরচ দেখিয়েছে বলে যে দাবি করা হয়েছে, তা সঠিক নয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও দাপ্তরিক নথি যাচাই করে দেখা গেছে, এই সীমানা প্রাচীর নির্মাণের সম্পূর্ণ কাজটি গণপূর্ত বিভাগই তাদের বরাদ্দের অধীনে করেছে, জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এখানে কোনো অর্থ ব্যয় করেনি।
প্রামাণ্যচিত্রের সংখ্যা ও ব্যয় নিয়ে অসত্য তথ্য: একাত্তর টিভির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ১৯টি প্রামাণ্যচিত্র তৈরিতে ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে (গড়ে প্রতিটিতে ২৭ লাখ)। প্রকৃতপক্ষে, ১৯টি ভিন্ন থিমের অধীনে মোট ৬২টি ছোট-বড় তথ্যচিত্র নির্মাণ করা হয়েছে এবং এতে ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ৯ লক্ষ টাকা। ৫ মিনিট দৈর্ঘ্যের মাত্র একটি প্রামাণ্যচিত্রের ব্যয় ছিল ১০ লাখ টাকা, আর বাকিগুলো ১৩ থেকে ৩৭ মিনিট দৈর্ঘ্যের বড় প্রামাণ্যচিত্র।
মিনহাজ ট্রেড ও রিকশা গ্যারেজের নেপথ্য কাহিনী: ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মিনহাজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’-এর ঠিকানায় অটোরিকশার দোকান পাওয়ার দাবিটি আংশিক সত্য হলেও প্রতিবেদনে প্রেক্ষাপট আড়াল করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পুরনো ট্রেড লাইসেন্সের ঠিকানায় বর্তমানে গ্যারেজ থাকলেও, তার ঠিক পাশেই (১৭৪ নম্বর হোল্ডিং) তাদের বর্তমান অফিস সচল রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত ডিস্ট্রিবিউটর বা লাইন প্রডিউসার হিসেবে দেশের নামকরা তরুণ নির্মাতাদের দিয়ে ৬২টি তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজটি সুসম্পন্ন করেছে।
গায়েবি প্রতিষ্ঠান ও স্বার্থের সংঘাতের দাবি ভুয়া: জাদুঘরের ভেতরের ভাস্কর্য ‘মাটি স্টুডিও’ বানালেও কাগজে ‘এইচকে ইন্টারন্যাশনাল’-এর নাম থাকার বিষয়টি কোনো জালিয়াতি নয়। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ নিয়মতান্ত্রিকভাবে এইচকে ইন্টারন্যাশনালকে কার্যাদেশ দিয়েছিল এবং তারা সাব-কন্ট্রাক্টে তেজস হালদারের মাটি স্টুডিওকে দিয়ে কাজটি করিয়েছে। এছাড়া, ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি মেরিনা তাবাসসুম নকশা প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাটেলিয়ার রবিন আর্কিটেক্ট’-এর পরামর্শক ছিলেন না, বরং তিনি বোর্ড সভাপতি হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছিলেন।
আপ্যায়ন ও নাস্তার বিল নিয়ে অতিরঞ্জন: ৬ মাসে আপ্যায়ন ও নাস্তার বিল ১ কোটি ২ লাখ টাকা হওয়ার দাবিটি কাল্পনিক। ১০ মাসের দাপ্তরিক ও ভ্যাট-ট্যাক্সের ভাউচার অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০ জন স্বেচ্ছাসেবক, দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও ভিভিআইপিদের আপ্যায়ন বাবদ মোট ৩৭ লক্ষ ৪৪ হাজার ৬৯৮ টাকা ব্যয় হয়েছে (দৈনিক গড়ে মাত্র ১২,২৩৮ টাকা)। মোহাম্মদপুরের ‘আড্ডা প্রবর্তনা’ রেস্টুরেন্টের বিলগুলো প্রতিদিন পরিশোধ না করে ১০-১৫ দিন পর পর চেকে দেওয়ায় একসঙ্গে বড় অঙ্কের বিলের সৃষ্টি হয়েছিল।
সাদা কাগজে ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ: স্বেচ্ছাসেবকদের টাকা দেওয়ার নামে সাদা কাগজে সই নিয়ে ১৫ লাখ টাকা তছরুপের দাবিটি সঠিক নয়। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দরপত্রের শর্তানুযায়ী সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে এই ১৫ লক্ষ টাকা স্বেচ্ছাসেবীদের সম্মানী বাবদ পরিশোধ করেছে; সরকারি তহবিল থেকে কোনো অর্থ সরাসরি উত্তোলন করা হয়নি।
মহাপরিচালকের যোগ্যতা ও টেন্ডার প্রক্রিয়া: জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাবকে কেবল ‘একজন ফটোগ্রাফার’ হিসেবে উল্লেখ করা ভুল। তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কিউরেটর, গবেষক এবং ‘ছবি মেলা’র সাবেক ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর। অন্যদিকে, টেন্ডার ছাড়া নির্দিষ্ট ভেন্ডরকে কাজ দেওয়ার দাবিটি সত্য। তবে ৫ আগস্টের মধ্যে জাদুঘর চালুর জন্য তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনায় এবং অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বিশেষ অনুমোদনেই দ্রুততার স্বার্থে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি (Direct Procurement) অনুসরণ করা হয়েছিল।
বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ভাইভার অভিযোগ: জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে তড়িঘড়ি করে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এবং বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা) নেওয়ার যে অভিযোগ মানবজমিন ও কালের কণ্ঠে করা হয়েছে, তা বড় ধরনের প্রশাসনিক অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়। দ্য ডিসেন্টের হস্তগত হওয়া সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুসারে, নিয়োগপ্রক্রিয়ার সময়সীমা ও স্বচ্ছতা নিয়ে উত্থাপিত এই প্রশ্নটি আংশিক সত্য।







