চীন-বাংলাদেশ করিডোর এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও উত্তরবঙ্গের চেহারায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। যেকোনো সাধারণ নাগরিকের জন্য দেশের স্বার্থে এই দুটি বড় প্রকল্প অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও উচ্ছ্বাসের কারণ হতে পারে।
তবে এই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের তৈরি করা একটি দীর্ঘমেয়াদি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী। আমলা, ব্যবসায়ী, সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং গণমাধ্যমকর্মীদের একাংশকে নিয়ে গঠিত এই চক্রটির কাছে দেশের সামগ্রিক স্বার্থের চেয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার ক্ষমতাই মুখ্য। এরাই বর্তমানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর “আগেই ভালো ছিলাম” প্রচারণা চালিয়ে দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে চাইছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ এখন আর কোনো স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে কাজ করছে না, বরং এটি দিল্লির একটি স্ট্র্যাটেজিক ইনস্ট্রুমেন্টে পরিণত হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোর যাতে আলোর মুখ না দেখতে পারে, সেজন্য দিল্লি এই শক্তিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। দিল্লির মূল উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় আনা নয়, বরং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাষ্ট্রীয় নীতিগত অবস্থান থেকে প্রতিহত করা। এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে তাঁর জীবননাশের মতো গভীর ষড়যন্ত্রও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কৌশলগতভাবে তারেক রহমান বর্তমানে বৈশ্বিক ত্রিভুজের তিনটি শক্তির মধ্যে অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষকে সফলভাবে ভারসাম্য (ব্যালেন্স) করতে সক্ষম হয়েছেন। জ্যামিতিক ও রাজনৈতিক সূত্র অনুযায়ী—ত্রিভুজের দুই বাহুর সমষ্টি যদি তৃতীয় বাহুর চেয়ে বৃহত্তর হয়, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শক্তিমত্তার এই নতুন বিন্যাস দিল্লির একচেটিয়া প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে।
ভারতের নিজের স্বার্থেই বাংলাদেশকে আর অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা উচিত হবে না; অন্যথায় এর পরিণতি দিল্লির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মারাত্মক হতে পারে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন কিংবা নতুন সরকার যদি এই ভূ-রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়, তবে দেশের সাধারণ মানুষের অস্তিত্ব যেমন সংকটে পড়বে, তেমনি সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকবে জিয়া পরিবার। কিন্তু দেশের বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম স্বার্থে সরকারকে এই ঝুঁকি নিতেই হবে; কারণ দিল্লিকে শান্ত রাখতে গিয়ে নিজ দেশের কোটি কোটি মানুষকে অভুক্ত রাখার কোনো সুযোগ নেই।
প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের ওপর দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে নানামুখী আন্তর্জাতিক চাপ আসবে। সরকারকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং কুনমিং-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর থেকে দূরে রাখতে নানা ছক তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তর থেকে সরকারকে পিছু হটতে না দেওয়ার জন্য নাগরিক ও রাজনৈতিক মহলের পাল্টা চাপ সৃষ্টি করা জরুরি।
দেশপ্রেমিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঐতিহাসিক মোড় থেকে কোনো কারণে পিছিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে দেশকে আবারও দিল্লির একক আধিপত্যের পকেটে তুলে দেওয়া। এই জাতীয় সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশপন্থী লিবারেল, লেফট, রাইট ও সেন্ট্রিস্টসহ সকল মতাদর্শের মানুষকে শক্ত জাতীয়তাবাদী অবস্থান নিতে হবে। কারণ আগামী পাঁচটি বছর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে কোনো আপসের সুযোগ নেই।







