দেশের পুঁজিবাজারে অনিয়ম, দুর্নীতি ও তদারকির ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংকট চলছে। সমন্বিত গ্রাহক হিসাব (সিসিএ) ও প্রকৃত সম্পদের ঘাটতিসহ নানা অনিয়মের কারণে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ২২টি ট্রেকহোল্ডার কোম্পানির লেনদেন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে এসব ব্রোকারেজ হাউসের বিনিয়োগকারীরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ডিএসইর কঠোর নজরদারি এবং অনিয়মে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
জানা গেছে, কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সিসিএতে থাকা বিনিয়োগকারীদের অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ, বাংকো সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ ও মশিউর সিকিউরিটিজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের অর্থ ঘাটতি শনাক্ত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঘাটতির তথ্য পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এনআরবিসি সিকিউরিটিজেও ৫২ কোটি টাকার ঘাটতি শনাক্ত করেছে ডিএসই। তবে প্রতিষ্ঠানটির লেনদেন এখনো চালু রয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন অনিয়মের কারণে আরও কয়েকটি সিকিউরিটিজ হাউসের লেনদেন স্থগিত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো সিকিউরিটিজ, সিনহা সিকিউরিটিজ, পিএফআই সিকিউরিটিজ, সালতা ক্যাপিটাল, অ্যালায়েন্স সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, ডন সিকিউরিটিজ, ইনডিকেট সিকিউরিটিজ, আল ফয়সাল সিকিউরিটিজ, শাহ মুহাম্মদ সগির অ্যান্ড কোম্পানি, ট্রেডক্যাপ স্টক ব্রোকারেজ, ফারইস্ট স্টক অ্যান্ড বন্ড, কবির সিকিউরিটিজ, মনার্ক হোল্ডিংস, স্নিগ্ধা ইকুইটিজ, সোনালি সিকিউরিটিজ, ট্রেড এক্স সিকিউরিটিজ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজ ও সামিন সিকিউরিটিজ।
বিএসইসি মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, গত কয়েক বছরে যেসব ব্রোকারেজ হাউস থেকে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর অর্থ দ্রুত বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে পরিশোধের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি, মালিকদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও তিনি জানান।
ডিএসইর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) আসাদুর রহমান বলেন, অনেক ট্রেকহোল্ডার কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে এবং কয়েকটির প্রকৃত মালিকানাও শনাক্ত করা যাচ্ছে না। কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ রয়েছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করলেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও তদন্ত করছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৪ জুন প্রধান কার্যালয় বন্ধ করে আত্মগোপনে যাওয়ার পর ক্রেস্ট সিকিউরিটিজে অনুসন্ধান চালিয়ে ১২৬ কোটি টাকার ঘাটতি পায় ডিএসই। পরে আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহিদুল্লাহ এবং তার পরিবারের সদস্যরা গ্রেপ্তার হন। পরবর্তী সময়ে তারা জামিনে মুক্তি পান।
২০২১ সালের ৭ জুন বাংকো সিকিউরিটিজে ১২৮ কোটি টাকার ঘাটতি শনাক্ত করে ডিএসই। একই মাসের ১৫ জুন প্রতিষ্ঠানটির লেনদেন বন্ধ করা হয়। তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল মুহিত ব্রিটিশ পাসপোর্টে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করলে বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হন। তিনিও পরে জামিনে মুক্তি পান।
এ ছাড়া ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর তামহা সিকিউরিটিজে ১৪০ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালের আগস্টে মশিউর সিকিউরিটিজে ১৬১ কোটি টাকার ঘাটতি শনাক্ত হয়। পরে এসব প্রতিষ্ঠানের লেনদেন স্থগিত করা হয়।
ডিএসই কর্মকর্তারা জানান, বছরের পর বছর সমন্বিত গ্রাহক হিসাব থেকে বিনিয়োগকারীদের জমাকৃত অর্থ আইনবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিজ হাউসগুলোর লেনদেন বন্ধ করা হয়েছে।
মশিউর সিকিউরিটিজের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বলেন, তিনি বেতনের অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন। ২০২৪ সালে জানতে পারেন, তার ব্রোকারেজ হাউস বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। এরপর থেকে তিনি অর্থ ফেরতের জন্য যোগাযোগ করলেও এখনো টাকা পাননি।
মশিউর সিকিউরিটিজের পরিচালক শেখ মোগল জান রহমান মৃদুল বলেন, গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কুয়াকাটায় থাকা আবাসিক হোটেল বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে। মাওনায় থাকা কিছু সম্পদও বিক্রি করা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য থাকা তহবিলও কাজে লাগানো হবে। সব মিলিয়ে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের পাওনা পরিশোধের জন্য চেক ইস্যু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ডিএসইর সাবেক চেয়ারম্যান আহমেদ ইকবাল হাসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কেন ট্রেকহোল্ডার কোম্পানিগুলোর লেনদেন বন্ধ রয়েছে, তার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য ফরেনসিক অডিট করা প্রয়োজন। এতে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
তিনি বলেন, অতীতে এ ধরনের সংকট দেখা দিলে শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হতো। এখন কেন সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। তার মতে, যারা বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করেছে, তাদের সম্পদ জব্দ করে সেই অর্থ বিনিয়োগকারীদের ফেরত দেওয়া উচিত।
ডিএসইর সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশিদ লালী বলেন, এ দায় ডিএসইর। এ বিষয়ে ডিএসইকেই কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে সদস্যপদ বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার নজির রয়েছে।
এদিকে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকা ব্রোকারেজ হাউসগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কমিশন বিশেষ অডিটর প্যানেল গঠন করে আগাম ঘোষণা ছাড়াই যেকোনো সময় ব্রোকারেজ হাউস পরিদর্শনের জন্য স্টক এক্সচেঞ্জকে নির্দেশ দিয়েছে। বিএসইসিও একইভাবে সরাসরি পরিদর্শন করবে।
গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল করা হবে। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে যেসব বিনিয়োগকারীর অর্থ ও শেয়ার তছরুপ হয়েছে, সেগুলো বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে দ্রুত পরিশোধের উদ্যোগ নিতে স্টক এক্সচেঞ্জকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
