সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর এবার রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা ও সম্মানি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সাংবিধানিক পদধারী ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র জানায়, অতীতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের সম্মানিও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এবারও একই প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে নিজেদের সম্মানি বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহী নন। কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য মনে করছেন, সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপের সময়ে জনপ্রতিনিধিদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং মন্ত্রী-এমপিদের সম্মানি পুনর্নির্ধারণ একই বিষয় নয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরির বিনিময়ে নির্ধারিত বেতন পান। অন্যদিকে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাই তাদের সম্মানি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনস্বার্থ ও দেশের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন বলেন, বর্তমান সংসদ সদস্যরা যে বেতন-ভাতা পান, তা অপ্রতুল। তবে দেশের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি বা দাবি নেই। সরকারপ্রধান এ বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তারা তা মেনে নেবেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও বিধি অনুবিভাগ) শামীম সোহেল বলেন, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বেতন বাড়ানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত এলে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা হবে। তিনি জানান, ‘রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ অ্যাক্ট’ সংশোধনের মাধ্যমে তাদের বেতন বাড়ানো হতে পারে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সম্মানিও বাড়তে পারে। নতুন বেতন কাঠামোয় সচিবদের মূল বেতন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান সম্মানির চেয়ে বেশি হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী তাদের সম্মানি পুনর্নির্ধারণের বিষয়টিও বিবেচনায় আসছে।
সচিবের বেতন এখন রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর সম্মানির চেয়ে বেশি
নবম জাতীয় পে স্কেলের নতুন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের সর্বোচ্চ মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ফলে একজন সচিবের মূল বেতন দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
অন্যদিকে ২০১৬ সালের দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্ট অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাসিক সম্মানি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর মাসিক সম্মানি ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা।
অর্থাৎ নতুন পে স্কেল অনুযায়ী সচিবের মূল বেতন রাষ্ট্রপতির বর্তমান সম্মানির চেয়ে ৩৬ হাজার এবং প্রধানমন্ত্রীর সম্মানির চেয়ে ৪১ হাজার টাকা বেশি। একইভাবে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের বর্তমান সম্মানিও সচিবদের মূল বেতনের তুলনায় কম।
তবে শুধু মূল বেতন দিয়ে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীদের মোট আর্থিক সুবিধা নির্ধারণ করা যায় না। এসব পদে দায়িত্ব পালনের সঙ্গে আবাসন, পরিবহন, চিকিৎসা, সরকারি স্টাফসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা যুক্ত রয়েছে।
আইন সংশোধন ছাড়া এমপি-মন্ত্রীদের সম্মানি বাড়ানো যাবে না
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো শুধু সরকারি আদেশ জারি করে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীদের সম্মানি বাড়ানোর সুযোগ নেই। তাদের সম্মানি প্রতিবছর স্বয়ংক্রিয় ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমেও বাড়ে না। এজন্য সংশ্লিষ্ট আইন বা আদেশ সংশোধন করে জাতীয় সংসদে বিল পাস করতে হয়।
সংসদ সদস্যদের বেতন ও ভাতা নির্ধারিত হয় ‘সংসদ সদস্য (পারিতোষিক ও ভাতাদি) আদেশ, ১৯৭৩’-এর আওতায়। আর প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের সম্মানি ও বিশেষাধিকার নির্ধারিত হয় সংশ্লিষ্ট আইনের মাধ্যমে।
২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পর ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সম্মানি-ভাতাও পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
তখন রাষ্ট্রপতির মাসিক সম্মানি ১ লাখ ২০ হাজার এবং প্রধানমন্ত্রীর ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। মন্ত্রীদের সম্মানি করা হয় ১ লাখ ৫ হাজার, প্রতিমন্ত্রীদের ৯২ হাজার এবং উপমন্ত্রীদের ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা। একই সময়ে সংসদ সদস্যদের মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয় ৫৫ হাজার টাকা।
মূল বেতনের বাইরে এমপিদের বিভিন্ন ভাতা
বর্তমানে একজন সংসদ সদস্যের মাসিক মূল বেতন ৫৫ হাজার টাকা। তবে বিভিন্ন ভাতা মিলিয়ে তার মাসিক নির্ধারিত আর্থিক সুবিধা ২ লাখ ১৪ হাজার ২০০ টাকা।
এর বাইরে সংসদ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য দৈনিক ৮০০ টাকা এবং যাতায়াত ভাতা হিসেবে ২০০ টাকা দেওয়া হয়। দেশের অভ্যন্তরে বিমান, রেল বা স্টিমারে ভ্রমণের জন্য বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার ট্রাভেল ভাউচার রয়েছে।
এ ছাড়া নির্বাচনী এলাকার কল্যাণে বছরে ৫ লাখ টাকা ঐচ্ছিক তহবিল এবং আকস্মিক মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকার বীমা সুবিধাও রয়েছে।
মন্ত্রীদের আবাসন ও গাড়িসহ বিভিন্ন সুবিধা
মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরাও মূল সম্মানির বাইরে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধা পান। তাদের জন্য সম্পূর্ণ সুসজ্জিত সরকারি বাসভবন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের সুবিধা রয়েছে।
সরকারি বাসভবনে না থাকলে মন্ত্রীরা মাসে ৮০ হাজার টাকা এবং প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা ৭০ হাজার টাকা আবাসন ভাতা পান।
৫৩ বছরে এমপিদের মূল বেতন বেড়েছে ১৩৭ গুণের বেশি
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদে ১৯৭৩ সালে একজন সংসদ সদস্যের মাসিক মূল বেতন ছিল ৪০০ টাকা। একই সময়ে একজন মন্ত্রীর বেতন ছিল ১ হাজার টাকা।
পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় আইন সংশোধনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের বেতন বাড়ানো হয়। ১৯৮৮ সালে তা ১ হাজার ৫০০, ১৯৯২ সালে ৩ হাজার, ১৯৯৮ সালে ৭ হাজার ৫০০, ২০০৫ সালে ১১ হাজার, ২০১০ সালে ১৫ হাজার এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে ৫৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
ফলে ১৯৭৩ সালের তুলনায় বর্তমানে সংসদ সদস্যদের মূল বেতন ১৩৭ গুণেরও বেশি বেড়েছে। তবে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যুক্ত থাকায় একজন সংসদ সদস্যের মোট আর্থিক সুবিধা শুধু মূল বেতন দিয়ে হিসাব করা যায় না।
সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন পদাধিকারীদের সম্মানির সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের বেতন তুলনা করা ঠিক নয়। জনপ্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়টি মূলত জনসেবার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা শুধু অর্থের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা যায় না। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীরা নিয়মিত বেতনভুক্ত চাকরিতে নিয়োজিত।
তিনি বলেন, ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলে এসব পদে আলাদা সম্মানির ব্যবস্থা ছিল না। সময়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার প্রয়োজন বিবেচনায় সম্মানি ও ভাতার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পর রাষ্ট্রপতি ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধির সম্মানি পুনর্নির্ধারণের একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছে।







