সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর পরিবেশের জন্য একসময়ের অন্যতম বড় দুশ্চিন্তা ছিল রাসায়নিকযুক্ত কঠিন বর্জ্য। খোলা জায়গায় ফেলার কারণে যা পরিবেশ ও নদীদূষণের প্রধান কারণ ছিল, তা-ই এখন রিসাইকেল বা প্রক্রিয়াজাত হয়ে প্রোটিন পাউডার ও জিলেটিন হিসেবে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।
বাণিজ্যিক সম্ভাবনার চিত্রটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। এক কেজি কাঁচা চামড়ার অবশিষ্টাংশের বাজারমূল্য মাত্র ১৩ থেকে ১৪ টাকা হলেও, তা উচ্চ প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করে জিলেটিন তৈরি করা হলে প্রতি কেজির দাম দাঁড়াচ্ছে ৪৫০ থেকে ৬৫০ টাকায়। তবে কাঁচামালের তীব্র সংকটের কারণে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে ওঠা দুটি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা বর্তমানে চরম উৎপাদনে ঘাটতির মুখোমুখি হয়েছে।
বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি এবং ইয়ংলি বায়োটেকনোলজি নামক দুটি প্রতিষ্ঠান চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য রিসাইকেল করার কাজটি দেশে প্রথমবারের মতো শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রধানত দুই ধরনের বর্জ্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে—কাঁচা চামড়া কাটার পর বাদ পড়া অংশ (র হাইড ট্রিমিং) এবং কেমিক্যালযুক্ত প্রক্রিয়াজাত নীলচে চামড়ার গুঁড়া বা টুকরা (ওয়েট ব্লু ট্রিমিং ও ডাস্ট)। কাঁচা অংশ থেকে জিলেটিন এবং কেমিক্যালযুক্ত বর্জ্য থেকে সার ও চামড়া মশরিন করার ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোটিন পাউডার তৈরি করা হয়।
কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বার্ষিক ৫ হাজার টন জিলেটিন উৎপাদনের জন্য প্রায় ৩০ হাজার টন কাঁচা চামড়ার টুকরা প্রয়োজন হলেও দেশে মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার টন বর্জ্য মিলছে। এসব কাঁচামালের একটি বড় অংশ অন্য প্রতিষ্ঠানে রপ্তানি ও বাইপাস হয়ে স্থানীয় পোল্ট্রি বা মৎস্য ফিডে চলে যাওয়ায় দেশীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প কাঁচামাল সংকটে পড়েছে। ফলে শতকোটি টাকার দেশীয় বিনিয়োগ রক্ষা ও ভ্যালু অ্যাড করার লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কাঁচা চামড়ার বর্জ্য সরাসরি রপ্তানি বন্ধের আবেদন জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি।
একই সাথে ট্যানারি এস্টেটের ভেতরের ফ্লেশিং বর্জ্য (চর্বি ও মাংসের অংশ) রিসাইকেল করে ট্যালো ও সার বানাতে বিসিকের কাছে ১ লক্ষ বর্গফুট জায়গা দাবি করেছে কোম্পানি দুটি। এর মাধ্যমে ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের ক্যাপসুল শেল তৈরিতে ব্যবহৃত কোটি কোটি ডলারের আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সনদ ও স্থানীয় ডাম্পিং প্ল্যান্টের সাথে তাদের সমঝোতা স্মারক সই শেষ হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ও নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এই উদ্যোগকে পরিবেশ সংরক্ষণে বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। তবে বিষাক্ত বর্জ্য যেন কোনোভাবেই মৎস্য ও পোল্ট্রি খাদ্যে না যেতে পারে সেদিকে নজর দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি। একই সাথে বিসিক ও ট্যানারি মালিকদের বর্জ্যের অপব্যবহার ঠেকাতে শুরুতে প্রণোদনা হিসেবে বিনামূল্যে কাঁচামাল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থার পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।
