যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সামরিক সরঞ্জাম আমদানির জন্য ৫ হাজারের বেশি সংস্থার একটি শক্তিশালী ও গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে ইরান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক ও ভারি ট্রাক আমদানি করেছে তেহরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর সংঘাতে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হলেও, এই বিশাল সরবরাহব্যবস্থার কল্যাণেই ইরান খুব দ্রুত তাদের অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, অত্যন্ত সুসংগঠিত এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতার সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘বুনিয়াদ’ নামের প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর গভীর যোগসূত্র রয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে জাহাজের পণ্য খালাসের বিল ও নৌপরিবহণের বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনা করে এই আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, পশ্চিমা দেশগুলো এই নেটওয়ার্কের নম্বরযুক্ত কোনো সংস্থার বিরুদ্ধেই কখনো কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি।
ইসরায়েলি-আমেরিকান ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘২৪০ অ্যানালিটিকস’-এর সহযোগিতায় রয়টার্স এই নেটওয়ার্কের সন্ধান পায়। নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত সংস্থাগুলোর নামের শুরুতে ইংরেজি ‘এমওডি’ (MOD) এবং ফারসিতে এর সংক্ষিপ্ত রূপ ‘ভিওডিজেএ’ ব্যবহারের পাশাপাশি পাঁচ বা ছয় অঙ্কের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা যুক্ত থাকে। এসব সংস্থার ঠিকানা ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এবং প্রতিষ্ঠার তারিখ ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি (যেদিন আয়াতুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন) উল্লেখ করা হলেও, কর্পোরেট নথিপত্র বলছে এগুলোর অধিকাংশই ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
মধ্যস্বত্বভোগী ও বিদেশি ভুয়া কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত এসব ‘ট্রাস্টি’ প্রতিষ্ঠান অবৈধ তেল বিক্রির অর্থ ব্যবহার করে ইরানের অস্ত্র কর্মসূচি সচল রেখেছে। রয়টার্সের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আমদানিকৃত চালানের ৯৭ শতাংশ ক্ষেত্রেই লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে ‘মুদ্রা স্থানান্তর ছাড়াই’। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর নজরে আসার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। চীন, রাশিয়া, জার্মানি ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রকেটের জ্বালানি, বিস্ফোরক, ভারী লঞ্চার এবং দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য নিখুঁত যন্ত্রপাতি এসব সংস্থার মাধ্যমে ইরানে আনা হয়েছে।
এই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ‘এমওডি ৩৪৬৪২৮’ নামের একটি সংস্থা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানই ২৩০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করে। এর মধ্যে চীন থেকে আমদানি করা ৮৮৬ টন সোডিয়াম ক্লোরেট ও পারক্লোরেটের মতো রাসায়নিক রয়েছে, যা কঠিন জ্বালানিচালিত রকেটের জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। গত বছরের এপ্রিলে বন্দর আব্বাসের শহীদ রাজায়ি বন্দরে এই রাসায়নিকের একটি চালানে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ৭০ জন নিহত ও ১২শ’র বেশি আহত হয়েছিলেন।
পাশাপাশি, সামরিক বাহিনীকে ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান হিসেবে ব্যবহারের জন্য ৪৩৫টি আইভেকো ট্রাক এবং হাজার হাজার টয়োটা হাইলাক্স ও ল্যান্ড ক্রুজার পিকআপ আমদানি করেছে সংস্থাটি। যুদ্ধের উত্তাপের মধ্যেও চীন ও রাশিয়া থেকে টাইটানিয়াম, নাইট্রোসেলুলোজ, বিস্ফোরক এবং ডেটোনেটর বা বিস্ফোরক সক্রিয় করার যন্ত্রের চালান নিয়মিতভাবে ইরানে পৌঁছাতে দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা এই পুরো ব্যবস্থাকে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বহর পুনর্গঠনের এক ‘শিল্পপর্যায়ের প্রচেষ্টা’ ও সামরিক বাণিজ্যের সম্পূর্ণ ‘বাস্তুতন্ত্র’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা ইরানি সরকারের অর্থনৈতিক লাইফলাইন বিচ্ছিন্ন করতে এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর পথ বন্ধ করতে সর্বদা তৎপর রয়েছে। অন্যদিকে, এই অনুসন্ধানের বিষয়ে ইরান, রাশিয়া, হোয়াইট হাউস বা সংযুক্ত আরব আমিরাত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। তবে চীন বিষয়টির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে।
