বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির চাকরিচ্যুতি এবং তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা সজীব ওয়াজেদ জয়, বিএনপির বিশেষ সহকারী রাশেদ খান এবং আমজনতা পার্টির নেতা তারেক রহমানের বক্তব্যের সমালোচনা করে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে দৈনিক আমার দেশ।
আমার দেশের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তাহসিফের চাকরিচ্যুতির সঙ্গে পত্রিকাটির প্রকাশিত প্রতিবেদনের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ, তাহসিফ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিমানবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত হন। অন্যদিকে, বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কথিত নেটওয়ার্ক নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট।
চাকরিচ্যুতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাহসিফের মৃত্যুর পর তাঁর বাবা জানিয়েছিলেন, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে বিমানবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তবে কী ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
আমার দেশ দাবি করেছে, চাকরিচ্যুতির প্রায় এক বছর পর প্রকাশিত প্রতিবেদনকে তাঁর চাকরি হারানোর কারণ হিসেবে তুলে ধরা তথ্যগতভাবে সঠিক নয়।
পত্রিকাটির বক্তব্য অনুযায়ী, তাহসিফ নিজেও একটি পডকাস্টে জানিয়েছিলেন, চাকরিচ্যুতির সময় তাঁর পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং প্রায় দুই বছর পর তিনি সেটি ফেরত পান।
‘র’-এর এজেন্ট বলা হয়নি: আমার দেশ
আমার দেশ-এর দাবি, তাহসিফকে প্রতিবেদনে সরাসরি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়নি। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ ও তা ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাটি অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরে কথিত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের প্রসঙ্গ সামনে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের আলোচিত ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিজের দপ্তরের কক্ষের জানালা থেকে তিনি ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন। অন্যদিকে, ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তাহসিফের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে উঠে আসে বলে দাবি করেছে পত্রিকাটি।
আমার দেশ আরও বলেছে, ভিডিওটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই শৃঙ্খলাভঙ্গসহ বিভিন্ন অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগ, কথিত গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।
জয় ও রাশেদ খানের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা
আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে সজীব ওয়াজেদ জয় অভিযোগ করেন, আমার দেশ-এর প্রচারণার কারণে তাহসিফের পেশাগত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং তাঁকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। এ ঘটনায় পত্রিকাটির সম্পাদক মাহমুদুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবিও জানান তিনি।
জয়ের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে আমার দেশ বলেছে, তাহসিফের চাকরিচ্যুতি এবং পত্রিকাটির প্রতিবেদন প্রকাশের সময়ের মধ্যে প্রায় ১১ মাসের ব্যবধান রয়েছে। তাই প্রতিবেদনটির কারণে তাঁর চাকরি চলে যাওয়ার অভিযোগটি পত্রিকাটির মতে ভিত্তিহীন।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী রাশেদ খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, আমার দেশ-এর প্রতিবেদন কয়েকবার পড়েও তিনি বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাননি। একই সঙ্গে তাহসিফকে ‘র’-এর এজেন্ট হিসেবে উপস্থাপনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি এবং এ বিষয়ে পত্রিকাটিকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান।
রাশেদ খানের বক্তব্যের সমালোচনা করে আমার দেশ প্রশ্ন তুলেছে, প্রতিবেদনটি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না পাওয়ার কথা বলার পরও কেন তিনি পত্রিকাটির বিরুদ্ধে জবাবদিহির দাবি তুলেছেন।
প্রতিবেদনের লেখক কে ছিলেন
আমার দেশ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট ‘বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরের ‘র’ নেটওয়ার্ক ফাঁস’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি সংগ্রহ করেছিলেন পত্রিকাটির তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ। বর্তমানে তিনি বিএনপি সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা।
পত্রিকাটির দাবি, প্রতিবেদনটির লেখক ও সংগ্রাহকের পরিচয় থাকা সত্ত্বেও সজীব ওয়াজেদ জয় এবং অন্য সমালোচকেরা সরাসরি সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে লক্ষ্য করে বক্তব্য দিয়েছেন।
মাহমুদুর রহমানের নাগরিকত্ব নিয়েও বিতর্ক
সজীব ওয়াজেদ জয়ের পোস্টে মাহমুদুর রহমানের তুরস্কের নাগরিকত্বের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এর জবাবে আমার দেশ জানিয়েছে, মাহমুদুর রহমান তাঁর বিভিন্ন লেখা ও টেলিভিশন আলোচনায় বাংলাদেশ ও তুরস্কের দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি নিজেই উল্লেখ করেছেন।
পত্রিকাটি আরও বলেছে, বিদেশি নাগরিকত্বের বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করার আগে রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্য ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা উচিত। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের অবস্থা সম্পর্কে পৃথকভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
জুলাই আন্দোলনে মাহমুদুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে পাল্টা বক্তব্য
আমজনতা পার্টির নেতা তারেক রহমান শুক্রবার জাপান সফর শেষে দেশে ফিরে দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনের পক্ষে মাহমুদুর রহমান কোনো বিবৃতি দেননি।
এর জবাবে আমার দেশ বলেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তুরস্ক থেকে মাহমুদুর রহমানের বক্তব্য প্রচার করা হয়েছিল।
পত্রিকাটি এই তথ্যকে জুলাই আন্দোলনে মাহমুদুর রহমানের ভূমিকার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
তদন্ত ও বিচারের দাবি
তাহসিফ সাউরির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্কের মধ্যে আমার দেশ বলেছে, রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পরিবর্তে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
পত্রিকাটির মতে, তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে তদন্তের আগে অনুমাননির্ভর বক্তব্য ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মাধ্যমে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত না করার আহ্বান জানিয়েছে পত্রিকাটি।
তবে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, এর সঙ্গে কারও অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা এবং কথিত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নির্ভরযোগ্য তদন্তের ফল ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
