৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটলেও সাধারণ নেতাকর্মীদের দুর্ভোগ কাটেনি। উল্টো স্থানীয় দলীয় পদধারী ‘হাইব্রিড’ নেতাদের প্রত্যক্ষ অত্যাচারে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের আমলের চেয়েও বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বেশি ভয়াবহ ও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা কৃষকদলের এক স্থানীয় নেতা।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর ২০২৬) দুপুরে লক্ষ্মীপুর জেলা শহরের একটি অভিজাত চাইনিজ রেস্টুরেন্টে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন শামীম গাজী। তিনি রায়পুর উপজেলা কৃষকদের সাবেক সদস্য সচিব এবং উত্তর চরবংশী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন গাজীর ছেলে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিজের ওপর চলা বঞ্চনা ও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন।
লিখিত বক্তব্যে শামীম গাজী অভিযোগ করেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো ১৩ বছরের শাসনামলে তিনি চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং জীবনের তাগিদে একটি দিনও রাতে নিজ বাড়িতে ঘুমাতে পারেননি। অথচ ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আশার আলো দেখার কথা থাকলেও উল্টো চিত্র তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে যে ফারুক কবিরাজকে রাজপথের কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে দেখা যায়নি, তিনি এখন ভোল পাল্টে ‘হাইব্রিড’ বিএনপি নেতা বনে গেছেন। উত্তর চরবংশী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হিসেবে পদ বাগিয়ে নেওয়ার পর থেকেই তিনি এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন।
শামীম আরও অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত বিএনপি নেতা ফারুক কবিরাজের ভাই মেহেদী কবিরাজের নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী পুরো ইউনিয়নে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে। এই চক্রটি এলাকার অন্তত দুই হাজার একর জমি বলপ্রয়োগ করে জবরদখল করেছে। পাশাপাশি চরের বিভিন্ন মাছঘাট দখল, চাঁদাবাজি, দুঃসময়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালিয়ে গোটা এলাকায় চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দিয়ে এলাকার প্রায় দুই হাজার নেতাকর্মীকে ঘরছাড়া করা হয়েছে, যাদের অনেকেই এখনো রাতে বাড়িতে ঘুমাতে পারেন না।
তার নিজ ব্যবসার ওপর চালানো ধ্বংসযজ্ঞের বর্ণনা দিয়ে শামীম জানান, ফারুক কবিরাজ ও তার অনুসারীদের ধারাবাহিক হামলা এবং চরম ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি এখনো নিজের বাড়িতে থাকতে পারছেন না। সন্ত্রাসীরা তার তিনটি লাভজনক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বলপূর্বক দখল করে নিয়েছে এবং প্রায় ২২ লাখ টাকা নগদ লুটপাট করেছে। দোকানে আগুন দিয়ে মালামাল পুড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মাছের বাক্স নদীতে ফেলে দিয়ে তাকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। বর্তমানে তিনি ও তার অনুসারী নেতাকর্মীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে শামীম গাজী আরও উল্লেখ করেন, উত্তর চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের আসন্ন প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যেই তাকে এবং তার অনুসারী নেতাকর্মীদের লাগাতার মিথ্যা মামলা দিয়ে নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতন করা হচ্ছে। এই ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার ও প্রতিকার পাওয়ার জন্য তিনি অবিলম্বে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া, উপজেলা বিএনপি এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে উত্তর চরবংশী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফারুক কবিরাজ তা পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার জেরে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও বাজারের উত্তেজিত জনগণ শামীমের ফার্মেসিতে হামলা চালিয়েছিল, যার সঙ্গে তিনি বা তার পরিবারের কেউ বিন্দুমাত্র জড়িত নন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে আনা বাকি সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে উড়িয়ে দেন তিনি।
অন্যদিকে এই ঘটনা সম্পর্কে রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, শামীম গাজীর মাছঘাটসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনার কথা তারা শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে থানায় সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ এখনো কেউ দায়ের করেননি। অভিযোগ পেলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
