ঠাকুরগাঁওয়ে সরকারি সারের ডিলার নিয়োগে ভয়াবহ দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। জেলার ৪টি উপজেলার ২৯টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় নতুন নিয়োগ পাওয়া ৩১ জন ডিলারের মধ্যে ২৮ জনই সরাসরি বিএনপি এবং এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা, সমর্থক ও তাঁদের নিকটাত্মীয়। মাত্র তিনজন অরাজনৈতিক বা ভিন্ন পরিচয়ের ব্যক্তি তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন।
নিয়োগের তালিকা বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, নতুন ডিলারদের মধ্যে ৯ জন বিএনপি নেতার স্ত্রী, ৪ জনের সন্তান, ২ জনের ভাই, ১ জন নেতার স্বজন এবং সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ১ জন রয়েছেন। এ ছাড়া ডিলারশিপ পেয়েছেন স্বয়ং বিএনপির পদে থাকা ৪ জন নেতা, ছাত্রদলের সাবেক ২ নেতা, মহিলা দলের ১ নেত্রী এবং তাঁতী দল ও ওলামা দলের ১ জন করে নেতা। নিয়োগ পাওয়া অনেকেরই সার বিক্রির ন্যূনতম পূর্বঅভিজ্ঞতা কিংবা সার সংরক্ষণের মতো নির্ধারিত ধারণক্ষমতার গুদাম পর্যন্ত নেই।
অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা আবেদন করলেও কেবল রাজনৈতিক পরিচয় না থাকায় বা দলীয় সুবিধা না পাওয়ায় তাঁরা ডিলারশিপ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এমনকি একাধিক প্রবাসী দেশে ফিরে এসেই কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়া ডিলারশিপ বাগিয়ে নিয়েছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবে অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ায় মাঠপর্যায়ে সার সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের সিন্ডিকেটের দখলে যাওয়ার চরম আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় কৃষক শক্তির কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব গোলাম মর্তুজা সেলিম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কৃষিপ্রধান দেশে ফসলের উৎপাদন ঠিক রাখতে সার সরবরাহ সহজ রাখা সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু সারের ডিলার নিয়োগেও যদি এভাবে দলীয়করণ ও পদের অপব্যবহার চলে, তবে পুরো কৃষিব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
তবে দলীয় প্রভাবের কথা অস্বীকার করেছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিনের বঞ্চিত নেতাকর্মীরা নতুন করে ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগ দেওয়ায় নিয়ম মেনেই আবেদন করেছেন এবং এখানে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়নি।
অন্যদিকে ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম এই অনিয়মের দায় পুরোপুরি স্থানীয় প্রশাসনের ওপর চাপিয়েছেন। তিনি জানান, ডিলার নিয়োগের সার্বিক যাচাই-বাছাই ইউএনও এবং ডিসির নেতৃত্বাধীন কমিটি করেছে, তাই কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায়ভার প্রশাসনের। তবে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ রফিকুল হক জানিয়েছেন, নীতিমালা মেনে উপজেলা কমিটির সুপারিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পরামর্শের ভিত্তিতেই তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল এবং সেই সুপারিশেই অনুমোদন এসেছে।
