মহাকাশ কূটনীতি ও প্রযুক্তির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় যুক্ত হতে চলেছে। চীনের আসন্ন বহুল প্রতীক্ষিত ‘শেনঝু-২৪’ (Shenzhou-24) মিশনে পেলোড স্পেশালিস্ট হিসেবে একজন পাকিস্তানি নভোচারীকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। এই ঐতিহাসিক মিশনের মাধ্যমে এই প্রথম কোনো বিদেশি নাগরিক সরাসরি চীনের নিজস্ব মহাকাশ স্টেশনে পা রাখতে চলেছেন এবং মহাকাশভ্রমণ সম্পন্ন করবেন। চলতি বছরের শেষের দিকে এই মহাকাশ অভিযানটি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
বেইজিংয়ের উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর আওতায় দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার অংশ হিসেবে এই মিশনটি পরিচালিত হচ্ছে। শেনঝু-২৪ মিশনের আওতায় নির্বাচিত নভোচারীরা মহাকাশে একটি স্বল্পমেয়াদী কক্ষপথীয় উড্ডয়ন বা অরবিটাল ফ্লাইট সফল করার পর পূর্ববর্তী ‘শেনঝু-২৩’ মহাকাশযানে চড়ে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন বলে পরিকল্পনা রয়েছে।
এই ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক মহাকাশ চুক্তির আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো পাকিস্তানের প্রথম চন্দ্রযান বা লুনার রোভার ‘জিন্না-১’ মহাকাশে পাঠানো। চীনের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার সার্বিক সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হতে যাওয়া ৩৫ কেজি ওজনের এই রোভারটিতে বেশ কিছু সর্বাধুনিক ও বিশেষায়িত বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম যুক্ত করা হয়েছে। এই রোভারটি চাঁদের সুনির্দিষ্ট পৃষ্ঠে নেমে প্লাজমা আচরণ, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ এবং চাঁদের মাটির রাসায়নিক ও ভৌগোলিক উপাদান নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণের কাজ পরিচালনা করবে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে এই সংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলশ্রুতিতে চীনা সরকারের তত্ত্বাবধানে পাকিস্তানি নভোচারীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানের কৃতি পাইলট জিশান আলী এবং খুররাম দাউদ বেইজিংয়ের মর্যাদাপূর্ণ চায়না অ্যারোনটিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারে বেশ কিছুদিন ধরে কঠোর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এই নিবিড় প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মূল আকর্ষণ ছিল ব্যবহারিক মহাকাশ কার্যক্রম পরিচালনা এবং সাবলীল চীনা ভাষা শিক্ষণ।
বর্তমানে চীন তাদের মহাকাশ কার্যক্রমে বিপুল পরিমাণ আর্থিক বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে এবং আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদের মাটিতে মানুষ বা নভোচারী পাঠানোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। মহাকাশ গবেষণার এই নতুন সমীকরণে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীন—এই তিন পরাশক্তি চাঁদে কৌশলগত পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের তীব্র প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতে চাঁদের মেরু অঞ্চলের গভীর গর্তে জমে থাকা বরফ গলিয়ে সুপেয় পানি, অক্সিজেন ও রকেট জ্বালানি উৎপাদনের জন্য এই পারমাণবিক চুল্লিগুলোর অপরিহার্য প্রয়োজন রয়েছে।
এই প্রতিযোগিতায় মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ২০৩০ সালের দশকের শেষ নাগাদ চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর বিপরীতে, রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে বা পৃথকভাবে ২০৩৬ সালের মধ্যেই চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।







