সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক বিএনপির সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের কথিত আপত্তিকর ও অসংলগ্ন ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় চরম রাজনৈতিক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এসব ভাইরাল ভিডিও ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চললেও, এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে সরকার বা বিএনপির হাইকমান্ড থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য বা কড়া সাংগঠনিক ব্যবস্থা প্রকাশ্যে আনা হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিএনপির চারজন হেভিওয়েট সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর কথিত ভিডিও নিয়ে সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য ফরহাদ হোসেন আজাদ, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমেদ চৌধুরী এবং সর্বশেষ নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের নাম জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। তবে ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিওর প্রকৃত সত্যতা নিরপেক্ষ কোনো সূত্রে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সর্বশেষ ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোর তালিকায় যুক্ত হওয়া নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজকে নিয়ে স্থানীয় রাজনীতির মাঠে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ক্লিপে তাঁকে একটি কক্ষের খাটে আপত্তিকর অবস্থায় দেখা যায় এবং এক নারী কণ্ঠের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন শোনা যায়। একদিকে ছাত্রদল নেতা হত্যা মামলায় এমপি-পুত্রের গ্রেফতারি পরোয়ানা, অন্যদিকে সংসদ সদস্যের নিজের অসংলগ্ন ভিডিও—এই দুইয়ে মিলে এলাকায় বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মীদের ক্ষোভ বিস্ফোরণমুখী রূপ নিয়েছে।
তবে নিজ ভিডিও ভাইরাল হওয়ার বিষয়টিকে পুরোপুরি বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁর সুনাম ও সুখ্যাতি ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে। বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির যুগে এআই (AI) ব্যবহার করে ছবি ও ভিডিও বিকৃত করা সম্ভব বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাটোরে যুবদল, ছাত্রদল ও মূল দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা ক্ষোভে ফুঁসছেন। রাজপথে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় আব্দুল আজিজকে দল থেকে বহিষ্কার ও জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগের জোর দাবি তুলেছেন দলীয় নেতাকর্মীরাই। এমনকি ঘটনার প্রতিবাদে একাধিক স্থানীয় নেতা দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন এবং বনপাড়া বাইপাসসহ বিভিন্ন স্থানে এমপির ছবি সংবলিত বিলবোর্ড ও ব্যানার ভাঙচুর করেছেন ক্ষুব্ধ কর্মীরা।
ঘটনার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নাটোর জেলা সনাকের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক মন্তব্য করেন, একজন সংসদ সদস্য আইন প্রণেতা ও সমাজের অভিভাবক। তাঁর কাছ থেকে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের নৈতিক স্খলনের বিষয়ে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শন করতে তিনি সরকারের শীর্ষপর্যায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
অন্যদিকে নাটোর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান আসাদ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দলের কেউ শৃঙ্খলা ও নীতি-নৈতিকতার ঊর্ধ্বে নন। আগামী আহ্বায়ক কমিটির বৈঠকে ভিডিও ফাঁসের ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করে তদন্ত সাপেক্ষে সাংগঠনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় অংশ অভিযোগ তুলছে যে, বিগত দিনে অন্য দলের ক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো যে ভূমিকা দেখিয়েছিল, বিএনপি নেতাদের ক্ষেত্রে তারা রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে। অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আজাদির ডাক’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, অতীতে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের ভিডিও ফাঁসের পর শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলো যেভাবে ধারাবাহিকভাবে রিপোর্ট করেছিল, বিএনপির প্রতিমন্ত্রীর ঘটনায় তারা সেই ভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণ করে এড়িয়ে যাচ্ছে।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রযুক্তিগতভাবে স্পর্শকাতর এ ধরনের স্ক্যান্ডাল কিংবা ভিডিও ফাঁসের ঘটনায় নিরপেক্ষতা ও সমান বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য অপরিহার্য। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর সত্যতা এবং এর পেছনের আসল বাস্তবতা নিশ্চিত করতে দ্রুত সরকারি ও দাপ্তরিক তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ পাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।







