বর্তমান করপোরেট সংস্কৃতিতে তরুণদের মধ্যে ‘হ্যাসেল কালচার’ বা অতিরিক্ত কাজের প্রবণতা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাত জেগে কাজ করা, বিশ্রাম না নেওয়া কিংবা ছুটির দিনেও কাজ চালিয়ে যাওয়াকে অনেক সময় সাফল্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের মাধ্যমে।
ইসলাম মানুষের জীবনে ভারসাম্য, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং শারীরিক সুস্থতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। কোরআনে আল্লাহ তাআলা রাতকে বিশ্রামের জন্য এবং ঘুমকে আরামের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
“তিনিই তোমাদের জন্য রাতকে করেছেন আবরণস্বরূপ এবং ঘুমকে করেছেন আরামপ্রদ, আর দিনকে করেছেন জীবিকা অর্জনের জন্য।”
(সুরা ফুরকান: ৪৭)
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে—
“আমি তোমাদের ঘুমকে করেছি ক্লান্তি দূরকারী এবং রাতকে করেছি আবরণস্বরূপ, আর দিনকে করেছি জীবিকা অন্বেষণের জন্য।”
(সুরা নাবা: ৯–১১)
শরীরেরও অধিকার রয়েছে
ইসলামে মানুষের শরীরকে আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই অতিরিক্ত পরিশ্রম করে শরীরের ক্ষতি করা বা বিশ্রাম থেকে বঞ্চিত করা সমর্থনযোগ্য নয়।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) নিয়মিত সারা রাত ইবাদত করতেন এবং প্রতিদিন রোজা রাখতেন। বিষয়টি জানার পর মহানবী (সা.) তাঁকে সংযমের শিক্ষা দিয়ে বলেন—
“রোজা রাখো, আবার বিরতিও দাও। রাতে নামাজ পড়ো, আবার ঘুমাও। তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার আছে, তোমার চোখেরও অধিকার আছে এবং তোমার স্ত্রীরও তোমার ওপর অধিকার আছে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৭৫)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, অতিরিক্ত নফল ইবাদতের ক্ষেত্রেও যদি শরীরের ক্ষতি করা নিরুৎসাহিত করা হয়, তাহলে কেবল দুনিয়াবি সফলতা বা অর্থ উপার্জনের জন্য ঘুম ও স্বাস্থ্যের অবহেলা আরও বেশি অনুচিত।
ঘুমের অভাবের ক্ষতি
দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যায়। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ, স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা এবং শারীরিক নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত কাজের চাপে মানুষ ধীরে ধীরে মানসিক প্রশান্তি ও পারিবারিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলে।
মহানবী (সা.) এশার নামাজের পর দ্রুত বিশ্রামে যাওয়ার এবং শেষ রাতে উঠে ইবাদত করার অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৮)। এই জীবনধারা শরীর ও মনের জন্য উপকারী এবং ভারসাম্যপূর্ণ।
রিজিকের ব্যাপারে তাওয়াক্কুল
অনেকেই মনে করেন, যত বেশি সময় কাজ করবেন, তত বেশি আয় হবে। কিন্তু ইসলাম শিক্ষা দেয়—পরিশ্রম করা মানুষের দায়িত্ব হলেও রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো জীব নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই।”
(সুরা হুদ: ৬)
তাই দিনের বেলা আন্তরিকভাবে কাজ করার পর রাতে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বিশ্রাম নেওয়াই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। অতিরিক্ত অর্থের লোভে নিজের স্বাস্থ্য নষ্ট করা কখনোই প্রজ্ঞার পরিচয় নয়, কারণ সুস্থ শরীর না থাকলে অর্জিত সম্পদেরও প্রকৃত উপকার ভোগ করা সম্ভব হয় না।
উপসংহার
ঘুম অলসতার নাম নয়; এটি আল্লাহর দেওয়া একটি বড় নেয়ামত এবং শরীরের ন্যায্য অধিকার। প্রকৃত সফলতা হলো এমন জীবন গড়ে তোলা, যেখানে ইবাদত, কাজ, পরিবার, বিশ্রাম ও শারীরিক সুস্থতার মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য বজায় থাকে।







