হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দান ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা আনা এবং মাজার প্রাঙ্গণে মদ-গাঁজার আসর বন্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেওয়ার একদিন পরই সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমকে বদলি করা হয়েছে। রোববার (২১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করার কথা জানানো হয়।
এর আগে শুক্রবার (২০ জুন) জুমার নামাজের আগে হযরত শাহপরাণ (রহ.) মাজার পরিদর্শনে গিয়ে মাজার মসজিদে উপস্থিত মুসল্লি ও সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক। বক্তব্যে তিনি মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা, দানের অর্থের জবাবদিহিতা এবং মাজারকেন্দ্রিক অপরাধ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ওলি-আউলিয়াদের স্মৃতিবিজড়িত এই পবিত্র স্থানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করতে হবে এবং মাজারকেন্দ্রিক একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ডিসি সারওয়ার আলম বলেন, মানুষ দান করতে চায়, তবে তারা জানতে চায় তাদের দানের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে। দানের অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে মানুষের আস্থা আরও বাড়বে। তিনি মাজার কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছ রাখতে হবে। অন্যথায় ভক্ত ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হবে।
বক্তব্যে তিনি মাজারে মাদক সেবন ও অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় অভিযোগ পাওয়া যায় যে কিছু মাজার এলাকায় মদ ও গাঁজার আসর বসে। এটি শুধু আইনত অপরাধ নয়, পবিত্র স্থানের মর্যাদারও পরিপন্থী। এ ধরনের কর্মকাণ্ড রোধে প্রশাসন এখন থেকে আরও কঠোর অবস্থান নেবে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, মাজার এলাকায় কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, সরকার মাজারের দানের অর্থ থেকে এক পয়সাও নেবে না। তবে দান সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল করতে হবে। হাতে হাতে দান সংগ্রহের পরিবর্তে নির্দিষ্ট দানবাক্সের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) বিকেলে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত তিনটি দানের ডেগ সিলগালা করা হয় এবং নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদ রানার উপস্থিতিতে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে দানবাক্সগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়।
জেলা প্রশাসনের দাবি, মাজারের দান সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে আরও নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং স্বচ্ছ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ভক্তদের দেওয়া সব দান প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে থাকা নির্ধারিত দানবাক্সে জমা হবে এবং হাতে হাতে অর্থ গ্রহণের সুযোগ থাকবে না।
তবে প্রশাসনের এই উদ্যোগকে ঘিরে মাজারের ভক্ত ও অনুসারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার রাতেই শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে হাজারো ভক্ত-অনুরাগী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। তারা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে ডেগ সিলগালার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি তোলেন।
এদিকে মাজারের দান ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এবং স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগের একদিন পর জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের আকস্মিক বদলি নিয়ে সিলেটে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বদলির পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে মাজারকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও তার প্রকাশ্য বক্তব্যের পরপরই এই বদলির ঘটনা বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।







