বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কখনোই লিওনেল মেসির মতো এত বেশি বয়সী কোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড় এমন বিস্ময়কর প্রভাব ফেলতে পারেননি। ৩৯ বছর বয়সেও আর্জেন্টিনার হয়ে পাঁচটি ম্যাচে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর এখনো অমলিন।
তবে দিন দিন আরও বেশি শারীরিক সক্ষমতানির্ভর হয়ে ওঠা এই খেলায় মেসি কীভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করছেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে বলের দিকে নয়, বরং পুরো ম্যাচজুড়ে তাঁর মুভমেন্টের দিকে চোখ রাখতে হবে। দেখা যাবে, ম্যাচের অধিকাংশ সময় মেসি হয় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন, নয়তো ধীর পায়ে হাঁটেন।
একসময় তিনি বিশ্বের সেরা ড্রিবলার, পাসদাতা এবং ফিনিশার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এখন তিনি সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর ‘হাঁটাহাঁটি করা’ ফুটবলার। ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিজের শক্তি সঞ্চয় করে রাখা এবং আক্রমণের জন্য নিখুঁত মুহূর্তটি বেছে নেওয়া।
ফিফার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচে মেসি মোট ৩৫ হাজার ৮৬৮ মিটার বা প্রায় ৩৬ কিলোমিটার অতিক্রম করেছেন। এর মধ্যে ২২ হাজার ৯৫৮ মিটার, অর্থাৎ মোট দূরত্বের ৬৪ শতাংশই তিনি কাটিয়েছেন ‘জোন ওয়ান’ বা ঘণ্টায় শূন্য থেকে ৭ কিলোমিটার গতিতে।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে ‘টেলিগ্রাফ স্পোর্ট’-এর এক পরীক্ষায় দেখা যায়, দ্বিতীয়ার্ধের ১৫ মিনিটের একটি নির্দিষ্ট সময়ে মেসি প্রকৃত অর্থে দৌড়েছেন মাত্র ৫১ সেকেন্ড। পুরো ৯০ মিনিটের হিসাবে সেটি দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ মিনিট।
গ্রুপ পর্ব শেষে টুর্নামেন্টের ৬১৮ জন আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের মধ্যে গোলসংখ্যায় শীর্ষে ছিলেন মেসি। অথচ একই সময়ে প্রতি ৯০ মিনিটে সবচেয়ে কম দূরত্ব অতিক্রমকারী খেলোয়াড়ও ছিলেন তিনিই। অর্থাৎ, সবচেয়ে কম শারীরিক পরিশ্রম করেও তিনি সবচেয়ে বেশি গোল করছেন।
আরেকটি বিস্ময়কর পরিসংখ্যান হলো, বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচ শেষে মেসি মোট ২৯৮টি উচ্চগতির দৌড় (হাই-স্পিড রান) দিয়েছেন। অথচ অন্য শীর্ষ আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের, যেমন হ্যারি কেইন (৬০০), ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (৫১৪), উসমান দেম্বেলে (৪৭৭) বা কিলিয়ান এমবাপ্পের (৩৩৬) এই সংখ্যা অনেক বেশি।
তবে প্রয়োজনে মেসি নিজের চেনা রূপেও ফিরেছেন। মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচের শেষ ২০ মিনিটে দল ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর তিনি যেন কৈশোরের সেই বিধ্বংসী মেসি হয়ে ওঠেন। উইংয়ে বল পেয়ে একের পর এক ড্রিবল করে প্রতিপক্ষকে বিধ্বস্ত করেন। ম্যাচ শেষে মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তিতে তিনি কেঁদেও ফেলেছিলেন।
মেসির এই ‘হাঁটাহাঁটি’র কৌশল কার্যকর করতে দলের বাকি নয়জন আউটফিল্ড খেলোয়াড়কে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। যখন মেসি শক্তি সঞ্চয় করেন, তখন দলকে মূলত ১০ জন নিয়ে রক্ষণ সামলাতে হয়।
এই দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি পালন করেন রদ্রিগো দি পল। যেখানে মেসি ম্যাচের ৬৪ শতাংশ সময় ধীর গতিতে কাটিয়েছেন, সেখানে দি পল পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ৪৪ শতাংশ সময় ধীর গতিতে ছিলেন। প্রায় একই দূরত্ব (৩৪ হাজার ৬৭৯ মিটার) দি পল অতিক্রম করেছেন মাত্র ৩৪৭ মিনিটে, যেখানে মেসির লেগেছে ৪৬৮ মিনিট।
পুরো মাঠজুড়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ছুটছেন ও নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছেন মূলত একজন মানুষের জন্যই। আর সেই আত্মত্যাগের প্রতিদানও মেসি দিয়েছেন দারুণভাবে। পাঁচ ম্যাচে তিনি করেছেন আটটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট।
শেষ পর্যন্ত তিনি আর্জেন্টিনাকে শিরোপার চূড়ায় পৌঁছে দিতে পারবেন কি না, তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় এখনই নিশ্চিত করে বলা যায়, ফুটবলের মাঠে হাঁটতে হাঁটতেও কীভাবে জাদুকরী প্রভাব ফেলা যায়, তা তিনি বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন।







