ঢাকা, ১৩ জুলাই: সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে রাজধানীর শাহবাগ থানায় পুলিশের ওপর হামলা ও যানবাহন ভাঙচুরের অভিযোগে পুলিশ একটি মামলা দায়ের করে। মামলায় কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। একই ঘটনায় সময় টেলিভিশনের সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকেও পৃথক মামলা করা হয়।
এদিকে সরকারের একাধিক মন্ত্রী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানালেও শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মামলা প্রত্যাহার এবং কোটা সংস্কারের লক্ষ্যে সংসদের জরুরি অধিবেশন আহ্বানের দাবি জানান। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
১৩ জুলাই ২০২৪ সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও ঢাকা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রেললাইন অবরোধ করে কর্মসূচি পালন করেন। সন্ধ্যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের বৈঠক শেষে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আগে পুলিশ ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা না থাকলেও পরে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা করেছে, যার জবাবদিহি প্রয়োজন। তিনি অভিযোগ করেন, মামলা-হামলা দিয়ে আন্দোলন দমন করা যাবে না এবং শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেন, ১৪ জুলাই সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে পদযাত্রা শুরু হবে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেবেন। পাশাপাশি দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন ও ছাত্র ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
ছাত্রনেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সরকারি চাকরির সব গ্রেডে ৫ শতাংশ কোটা রাখা যেতে পারে, যার আওতায় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদের জন্য কোটা বহাল রাখাকে তিনি বৈষম্যমূলক বলে উল্লেখ করেন।
আরেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। কুমিল্লায় পুলিশের গুলিবর্ষণ ও হামলার অভিযোগের পর কেন্দ্রীয় নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আন্দোলনের নেতা সারজিস আলম বলেন, আন্দোলন শুরুর পরও সরকার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। দমন-পীড়নের পথ বেছে নিলে তার দায় সরকারকেই নিতে হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আপিল বিভাগের রায় না আসা পর্যন্ত কোটা নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে না। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ অভিযোগ করেন, বিএনপি আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতও আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান হারুন অর রশীদ বলেন, আন্দোলনে অন্য কোনো পক্ষ অনুপ্রবেশ করেছে কি না এবং ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করছে পুলিশ।
এদিকে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন দাবি করেন, আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজন হলে ছাত্রলীগ ব্যবস্থা নেবে।
একই দিনে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালসহ সাত দফা দাবিতে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ শাহবাগে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করে।







